চীনের প্রোডাক্ট বাংলাদেশে আমদানি করার প্রক্রিয়া স্টেপ বাই স্টেপ স্ক্রিনশট সহ
চীন থেকে মাল আনার কথা শুনলেই মনে হয় এটা অনেক ঝামেলার কাজ। আমারও প্রথমে তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে বুঝলাম, প্রসেসটা জানলে আসলে এত কঠিন না। এখন বাংলাদেশের অনেকেই ছোট ছোট ব্যবসার জন্য চীন থেকে জিনিস এনে ফেসবুক আর দারাজে বিক্রি করতেছে। কারণ ওখানে দাম কম আর জিনিসের অপশন অনেক।
এই লেখায় আমি চেষ্টা করছি চীন থেকে মাল আনার পুরো প্রসেসটা সহজভাবে বলতে। সাপ্লায়ার খোঁজা, শিপিং করা, কাস্টমস ক্লিয়ার করা আর লাভ হিসাব করা। এই ধাপগুলোই মূলত জানা লাগে। আমি নিজে যা শিখেছি আর যেখানে ভুল করেছি, সেটাই এখানে শেয়ার করতেছি যাতে নতুন কেউ শুরু করলে একটু সহজ হয়।
সুচিপত্র:চীনের প্রোডাক্ট বাংলাদেশে আমদানি করার প্রক্রিয়া স্টেপ বাই স্টেপ স্ক্রিনশট সহ
- চীন থেকে প্রোডাক্ট আমদানি কেন লাভজনক
- আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ট্রেড লাইসেন্স, BIN, IRC
- সঠিক সাপ্লায়ার খোঁজার উপায় Alibaba, 1688, Made-in-China
- প্রোডাক্ট নির্বাচন ও দাম যাচাই করার নিয়ম
- সাপ্লায়ারের সাথে যোগাযোগ ও নেগোশিয়েশন
- পেমেন্ট করার নিরাপদ পদ্ধতি: TT, Payoneer, Escrow
- শিপিং মেথড নির্বাচন Air, Sea, DHL, FedEx
- চীন থেকে বাংলাদেশে শিপিং খরচ ক্যালকুলেশন
- কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ডিউটি-ট্যাক্স হিসাব
- C&F এজেন্ট ছাড়া নিজে প্রোডাক্ট ছাড়ানোর প্রক্রিয়া
- স্ক্রিনশট সহ Alibaba থেকে অর্ডার করার পুরো ধাপ
- কমন ভুল আর সেগুলো এড়ানোর উপায়
- ডেলিভারি ট্র্যাকিং ও কাস্টমারকে আপডেট
- প্রোডাক্টে সমস্যা হলে রিটার্ন/রিফান্ড নেয়ার প্রসেস
- ছোট বিজনেস শুরু করার জন্য বাজেট প্ল্যান
- শেষ কথা
চীন থেকে প্রোডাক্ট আমদানি কেন লাভজনক
চীনকে সবাই বলে দুনিয়ার কারখানা। কারণ ওখানে জিনিসপত্র বানাতে খরচ খুব কম লাগে। আমাদের দেশে যেটা ১০ টাকায় কিনতে হয়, চীনে সেটা ৪০-৫০ টাকায় পাওয়া যায়। তাই কম দামে এনে বেশি দামে বেচলে লাভটাও বেশি হয়। এজন্যই অনেক ছোট ব্যবসায়ী এখন চীনের দিকেই ঝুঁকছে।আরেকটা বড় কারণ হলো ভ্যারাইটি। চীনে এমন অনেক জিনিস পাবেন যেগুলো বাংলাদেশে এখনো আসেনি। নতুন ডিজাইনের মোবাইল কভার, লাইট, খেলনা—এসব জিনিস ফেসবুকে দিলে মানুষ সাথে আগ্রহ দেখায়। ইউনিক জিনিস থাকলে প্রতিযোগিতাও কম হয়।
আগে শুধু বড় ব্যবসায়ীরা কনটেইনার ভরে মাল আনতে পারত। কিন্তু এখন আলিবাবা আর ১৬৮-এর কল্যাণে ৫-১০ পিসও অর্ডার দেওয়া যায়। DHL, সুন্দরবন কুরিয়ার এগুলো দিয়ে ছোট পার্সেলও চলে আসে। মানে হাতে ৫-১০ হাজার টাকা থাকলেও শুরু করা যায়। রিস্কও কম থাকে। চীনের সাপ্লায়াররা বড় অর্ডারে দাম অনেক কমিয়ে দেয়। ধরুন একটা জিনিস ১০ পিস নিলে ২ ডলার, কিন্তু ৫০ পিস নিলে ১.২০ ডলারে দিয়ে দেয়। এই সিস্টেমটা বাংলাদেশে নাই। তাই একবার যদি ভালো সাপ্লায়ার পেয়ে যান, তাহলে ধীরে ধীরে ব্যবসা বড় করা যায়।
আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস: ট্রেড লাইসেন্স, BIN, IRC
চীন থেকে মাল আনতে গেলে আগে কিছু কাগজ ঠিক করতে হয়। না হলে কাস্টমস আটকে দেয়। সবার আগে লাগে ট্রেড লাইসেন্স। এটা হলো আপনার ব্যবসার প্রমাণপত্র। নিজের এলাকার সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন অফিসে গেলেই ২-৩ হাজার টাকায় বানিয়ে ফেলা যায়। দোকানের নাম আর কী ব্যবসা করবেন সেটা লিখে দিলেই হয়ে যায়।এরপর লাগে BIN নাম্বার। এটা VAT অফিস দেয়। চীন থেকে কিছু আনলে সরকারকে VAT আর ট্যাক্স দিতে হয়, তাই BIN ছাড়া মাল ছাড়াবে না। এখন অনলাইনে আবেদন করা যায়, তাই আগের মতো ঘোরাঘুরি করতে হয় না। ২-৩ দিনের মধ্যেই পেয়ে যাবেন।
আরেকটা জিনিস হলো IRC। পুরো নাম Import Registration Certificate। এটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স আর BIN থাকলে IRC-এর জন্য আবেদন করা যায়। IRC হাতে আসলে আপনি অফিসিয়ালি বিদেশ থেকে জিনিস আনতে পারবেন।অনেকেই ভয় পায় এই কাগজপত্রের ঝামেলায়। কিন্তু আসলে একবার করে ফেললে ৫-৭ বছর কোনো ঝামেলা নাই। আর যদি এখনই না থাকে, তাহলে শুরুতে C&F এজেন্ট দিয়ে কাজ চালানো যায়। ওরা নিজেদের কাগজ ব্যবহার করে মাল ছাড়িয়ে দেয়।তবে আমি মনে করি শুরু থেকেই নিজের নামে কাগজ করে রাখা ভালো। কারণ পরে যখন ব্যবসা বড় হবে, তখন ব্যাংক থেকে লোন নিতে, এলসি খুলতে সব জায়গায় এই কাগজ লাগবে। শুরুতে একটু খরচ হলেও পরে অনেক সুবিধা পাবেন।
সঠিক সাপ্লায়ার খোঁজার উপায়: Alibaba, 1688, Made-in-China
চীন থেকে মাল আনার সবচেয়ে বড় কাজ হলো ভালো সাপ্লায়ার পাওয়া। যদি ভুল জায়গা থেকে অর্ডার দেন, তাহলে জিনিস খারাপ আসতে পারে বা টাকাই মেরে দিতে পারে। তাই আমি সাধারণত Alibaba, 1688 আর Made-in-China এই তিনটা সাইট দেখি। এখানে লাখ লাখ সাপ্লায়ার আছে, দামও সরাসরি ফ্যাক্টরি থেকে পাওয়া যায়।Alibaba সবচেয়ে সহজ। এখানে ইংরেজিতে কথা বলা যায়, আর “Trade Assurance” নামে একটা সিস্টেম আছে। মানে আপনি টাকা দেবেন, কিন্তু সাপ্লায়ার মাল না পাঠালে আলিবাবা টাকা ফেরত দিয়ে দেয়। প্রথমবার অর্ডার দিলে এটা ইউজ করাই ভালো। 1688-এ দাম আরও কম, কিন্তু ওখানে সব চাইনিজে লেখা। গুগল ট্রান্সলেট ইউজ করে চালাতে হয়।
সাপ্লায়ার বাছার সময় আমি আগে দেখি তার পাশে “Gold Supplier” লেখা আছে কিনা। এটা মানে আলিবাবা যাচাই করে দেখেছে কোম্পানিটা আসল। তারপর রিভিউ আর রেটিং দেখি। যাদের রেটিং ৪.৫ এর উপরে আর অনেক রিভিউ আছে, তাদের সাথে কাজ করা নিরাপদ। ছবি দেখে বোঝা যায় না, তাই আমি মেসেজ দিয়ে প্রোডাক্টের রিয়েল ছবি চাই।কথা বলার সময় সরাসরি জিজ্ঞাসা করি, ভাই, এই প্রোডাক্টের কোয়ালিটি কেমন? ভিডিও দিতে পারবেন? যারা দ্রুত উত্তর দেয় আর ভিডিও পাঠায়, তাদের বিশ্বাস করা যায়। আর যারা শুধু দাম কম বলেই শেষ, তাদের থেকে দূরে থাকি। কারণ কম দামে প্রায় সময়ই খারাপ মাল আসে
আরো পড়ুন:ডেলিভারি ট্র্যাকিং ও কাস্টমারকে আপডেট দেয়ার নিয়ম
প্রোডাক্ট অর্ডার করার পর ট্র্যাকিং
প্রোডাক্ট অর্ডার করার পর কাজ শেষ হয়ে যায় না। মালটা ঠিকমতো যাচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হয়। সাপ্লায়ার যখন মাল পাঠায় তখন একটা ট্র্যাকিং নাম্বার দেয়। ওই নাম্বারটা দিয়ে 17track বা DHL এর সাইটে গেলে দেখা যায় মাল এখন কোথায় আছে।আমি যেটা করি, মাল পাঠানোর পর কাস্টমারকে একটা মেসেজ দিয়ে জানাই যে আপনার পার্সেল চীন থেকে বের হয়েছে। তারপর যখন বাংলাদেশে এসে পৌঁছায় তখন আবার জানাই। আর যখন কুরিয়ারে দিয়ে দেই তখন ফাইনাল মেসেজ দিয়ে দেই যে ২-৩ দিনের মধ্যে পেয়ে যাবেন। মাঝে মাঝে ট্র্যাকিং এর স্ক্রিনশটও পাঠিয়ে দেই, এতে কাস্টমার নিশ্চিন্ত থাকে।
কখনো কখনো দেখা যায় মাল কাস্টমসে আটকে যায়। তখন ভয় পাওয়ার কিছু নাই। কাস্টমারকে সরাসরি বলে দেই যে মাল কাস্টমসে আছে, ক্লিয়ার হতে ২-১ দিন লাগবে। সত্যি কথা বললে কাস্টমার বোঝে। লুকালে পরে ঝামেলা হয়।আর একটা জিনিস খেয়াল রাখি, ডেলিভারি হয়ে গেলে কাস্টমারকে একটা ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করি মাল ঠিকমতো পেয়েছে কিনা। পেয়ে গেলে রিভিউ চাই। এই ছোট কাজটাতে পরেরবার আবার অর্ডার করার চান্স বেড়ে যায়।
প্রোডাক্ট নির্বাচন ও দাম যাচাই করার নিয়ম
চীন থেকে মাল আনতে গেলে সবচেয়ে বড় কাজ হলো সঠিক প্রোডাক্ট বাছা। সব জিনিস আনলে চলে না। আমি যেটা করি, আগে দেখি ফেসবুক আর টিকটকে এখন কী ট্রেন্ড চলছে। যেমন কিছুদিন আগে LED লাইট, মিনি ফ্যান এইসব খুব চলছিল। ট্রেন্ডি জিনিস আনলে দ্রুত বিক্রি হয়।প্রোডাক্ট বাছার পর দাম যাচাই করাটা জরুরি। আলিবাবাতে একই জিনিস ১০ জন সাপ্লায়ার ১০ দামে দেখায়। আমি সাধারণত ৫-৬টা দোকান খুলে দাম মিলিয়ে দেখি। সবচেয়ে কম দাম যেটা, সেটাই সবসময় বেস্ট না। কারণ অনেক সময় দাম কম মানে কোয়ালিটিও খারাপ।
দাম যাচাই করার সময় শিপিং খরচও দেখতে হয়। ধরুন একটা জিনিসের দাম ২ ডলার, কিন্তু শিপিং ৫ ডলার। তাহলে মোট খরচ ৭ ডলার পড়ে যাবে। তাই আমি সবসময় মোট খরচ হিসাব করি। বাংলাদেশে আনলে কত পড়বে, সেটা আগে থেকে বের করে রাখি।আরেকটা জিনিস করি আমি, সাপ্লায়ারকে বলি “ভাই, স্যাম্পল পাঠাতে পারবেন? ২-৩ ডলার বেশি লাগলেও স্যাম্পল দেখে নিলে পরে লস হয় না। স্যাম্পল দেখে যদি মনে হয় কোয়ালিটি ঠিক আছে, তখনই বড় অর্ডার দেই।সবশেষে বলব, অল্প দাম দেখে লাফিয়ে পড়বেন না। আগে মার্কেট দেখুন, লোকজন কী কিনছে, দাম কেমন। তারপর নিজে হিসাব করে দেখুন লাভ থাকবে কিনা। এই হিসাবটা ঠিক না করলে চীন থেকে আনলেও লাভ হবে না, উল্টা লস হবে।
সাপ্লায়ারের সাথে যোগাযোগ ও নেগোসিয়েশন
চীন থেকে মাল আনতে গেলে সাপ্লায়ারের সাথে কথা বলাটাই আসল কাজ। আমি সাধারণত আলিবাবা অ্যাপের চ্যাট ইউজ করি। ইংরেজি না পারলেও সমস্যা নাই, গুগল ট্রান্সলেট ইউজ করে মেসেজ দেই। ওরাও বুঝে যায়।প্রথম মেসেজে আমি সোজা জিজ্ঞাসা করি, ভাই এই প্রোডাক্টের দাম কত? ১০ পিস নিলে কত পড়বে? সরাসরি কথা বললে ওরাও সিরিয়াস হয়। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বললে দাম কমায় না।নেগোসিয়েশনের সময় আমি কখনো একবারে রাজি হই না। ওরা ৫ ডলার বললে আমি বলি ৩.৫ ডলারে দিতে পারবে কিনা।
এভাবে একটু দর কষাকষি করলে ১০-২০% দাম কমে যায়। শিপিং ফ্রি করে দেয় কিনা সেটাও জিজ্ঞাসা করি।আরেকটা জিনিস করি, স্যাম্পল চাই। বলি “ভাই, ২-৩ পিস স্যাম্পল পাঠাতে পারবেন? কোয়ালিটি দেখে বড় অর্ডার দেবো।” যারা আসল সাপ্লায়ার, ওরা স্যাম্পল পাঠায়। যারা না পাঠায়, ওদের থেকে দূরে থাকি।শেষ কথা হলো, ভদ্রভাবে কথা বলুন কিন্তু কনফিডেন্ট থাকুন। সাপ্লায়ার বুঝে গেলে আপনি নতুন, তখন দাম বেশি চায়। তাই এমনভাবে কথা বলুন যেন মনে হয় আপনি আগেও অনেকবার মাল আনছেন। এভাবে করলে ভালো ডিল পাওয়া যায়।
পেমেন্ট করার নিরাপদ পদ্ধতি: TT, Payoneer, Escrow
চীন থেকে মাল আনলে টাকা পাঠানো নিয়ে আসল ঝামেলা। একবার ভুল জায়গায় দিয়ে দিলে টাকা শেষ। আমি সাধারণত তিনভাবে টাকা পাঠাই - TT, Payoneer আর আলিবাবার Escrow দিয়ে।TT হলো ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠানো। এটা জলদি হয় ঠিকই, কিন্তু নতুন সাপ্লায়ার হলে আমি দেই না। কারণ টাকা গেলে আর ফেরত আনা যায় না। শুধু পুরান পরিচিত লোক হলে তখন TT করি।Payoneer ব্যবহার করতে আমার সুবিধা লাগে। অ্যাকাউন্ট খুলে ডলার লোড করলেই সাপ্লায়ারকে পাঠানো যায়।
আর টাকা গেল কই, সেটা অ্যাপেই দেখা যায়। সমস্যা হলে সাপোর্টে মেসেজ দিলে ওরা হেল্প করে।সবচেয়ে সেইফ হলো আলিবাবার Trade Assurance। এটাকে বলে Escrow সিস্টেম। মানে আপনি টাকা দেবেন, কিন্তু আলিবাবা সেটা আটকে রাখবে। আপনি মাল হাতে পেয়ে ঠিক আছে বলার পরই সাপ্লায়ার টাকা পাবে। মাল না আসলে টাকা ফেরত।আমি প্রথমে সবসময় Trade Assurance দিয়েই শুরু করি। ১০-২০ পিস টেস্ট অর্ডার দিয়ে দেখি মাল কেমন আসে। ভালো হলে পরে বড় অর্ডারে অর্ধেক আগে, অর্ধেক পরে দেই। এভাবে করলে টেনশন কম থাকে।
আরো পড়ুন :প্রোডাক্টে সমস্যা হলে রিটার্ন/রিফান্ড নেয়ার প্রসেস
প্রোডাক্টে সমস্যা হলে রিটার্ন/রিফান্ড নেয়ার প্রসেস
চীন থেকে মাল আনলে মাঝে মাঝে মাল খারাপ আসে বা ভুল মাল চলে আসে। তখন ভয় পেলে হবে না, Alibaba তে Dispute খোলার সিস্টেম আছে। প্রথমে মাল হাতে পাওয়ার সময় ভিডিও করে রাখি। যদি দেখি মাল ভাঙা বা ভুল আসছে, তাহলে ওই ভিডিও আর ছবি প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।তারপর Alibaba অ্যাপে গিয়ে My Orders থেকে যে অর্ডারে সমস্যা সেটায় Open Dispute দিই। Dispute খুললে দুইটা অপশন আসে। একটা হলো Refund Only, মানে মাল ফেরত না দিয়েই টাকা ফেরত চাওয়া।
আরেকটা হলো Return and Refund, মানে মাল ফেরত পাঠিয়ে টাকা ফেরত নেওয়া।ছোট জিনিস হলে আমি সাধারণত Refund Only নেই, কারণ চীনে মাল ফেরত পাঠানোর খরচ অনেক বেশি পড়ে। Dispute দেওয়ার পর সাপ্লায়ারকে ৭ দিন সময় দেয় রিপ্লাই দেওয়ার জন্য। যদি সাপ্লায়ার মানে তাহলে টাকা ফেরত পেয়ে যাই। না মানলে Alibaba নিজে দেখে সিদ্ধান্ত দেয়।আমার একবার ২০০ পিস কাভারের মধ্যে ৩০ পিসে কালার ভুল ছিল। আমি প্রমাণ দিয়ে Dispute খুলছিলাম, পরে ৪০ ডলার ফেরত পাইছিলাম।
শিপিং মেথড নির্বাচন: Air, Sea, DHL, FedEx
চীন থেকে মাল আনলে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা হয় শিপিং নিয়ে। আমি সাধারণত ৪টা অপশন দেখি - Air, Sea, DHL আর FedEx। কোনটা নিবেন সেটা নির্ভর করে আপনি কী আনতেছেন আর কত জলদি লাগবে।ছোট জিনিস আর তাড়াতাড়ি লাগলে আমি এয়ার শিপিং নেই। ৭-১০ দিনের মধ্যে হাতে চলে আসে। দাম একটু বেশি পড়ে, কিন্তু প্রোডাক্ট দ্রুত বিক্রি করে দিলে লস হয় না। মোবাইল এক্সেসরিজ, কসমেটিকসের জন্য এটাই ভালো।বড় মাল আর সময় থাকলে সি শিপিং বেস্ট। জাহাজে আসতে ৩০-৪৫ দিন লাগে ঠিকই, কিন্তু খরচ অনেক কম।
ফার্নিচার, বড় ইলেকট্রনিক্স আনলে আমি এটাই ইউজ করি। ওজন বেশি হলে সি শিপিং ছাড়া উপায় নাই।DHL আর FedEx হলো কুরিয়ার সার্ভিস। এগুলা সুপার ফাস্ট, ৩-৫ দিনেই চলে আসে। কিন্তু ১ কেজির জন্য ১৫০-২০০ টাকা চার্জ করে। আমি শুধু স্যাম্পল আনতে বা আর্জেন্ট অর্ডারের জন্য ইউজ করি।আমি যেটা করি, আগে সাপ্লায়ারকে জিজ্ঞাসা করি ও কোন শিপিং সাপোর্ট করে। তারপর ওজন আর দাম হিসাব করে দেখি কোনটা সস্তা পড়বে। নতুন হলে DHL দিয়ে টেস্ট করুন, পরে ব্যবসা বড় হলে সি শিপিংয়ে চলে যান।
চীন থেকে বাংলাদেশে শিপিং খরচ ক্যালকুলেশন
মাল আনতে গেলে শিপিং খরচ ঠিকমতো না হিসাব করলে লাভ বোঝা যায় না। আমি প্রথমে প্রোডাক্টের ওজন আর সাইজ সাপ্লায়ারকে জিজ্ঞাসা করি। বলি “ভাই, ২০ পিসের মোট ওজন কত হবে?” ওরা প্যাক করে বলে দেয়।তারপর শিপিং এজেন্টকে মেসেজ দেই। জিজ্ঞাসা করি চীন থেকে ঢাকা পর্যন্ত এয়ার আর সি শিপিংয়ের রেট কত। এয়ার শিপিংয়ে এখন ১ কেজি ৮০ থেকে ১২০০ টাকা নেয়। সি শিপিংয়ে ১ CBM প্রায় ৮-১২ হাজার টাকা পড়ে।
এখানে একটা ট্রিক আছে। ওজন কম হলে এয়ার সস্তা পড়ে, আর ওজন বেশি হলে সি শিপিং সস্তা হয়। তাই আমি দুইটারই হিসাব করি। যেটা কম আসে সেটাই নেই। ছোট মাল হলে এয়ার, বড় মাল হলে সি।খরচের সাথে আমি সবসময় ১০-১৫% বাড়তি ধরে রাখি। কারণ প্যাকিং, হ্যান্ডলিং, কাস্টমসে ছোটখাটো খরচ লাগে। এগুলা হিসাব না করলে পরে দেখা যায় লাভ নাই।
কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ডিউটি-ট্যাক্স হিসাব
মাল বাংলাদেশে আসলে কাস্টমসে আটকায়, তখন ডিউটি আর ট্যাক্স দিতে হয়। আমি প্রথমে প্রোডাক্টের HS Code বের করি। এটা হলো প্রতিটা জিনিসের আলাদা কোড। এই কোড দিলে বোঝা যায় কত % ট্যাক্স লাগবে।ধরুন আপনি মোবাইল কভার আনলেন। HS Code চেক করলে দেখবেন ২৫% ডিউটি, ১৫% VAT, আর কিছু সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি লাগতে পারে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০-৫০% খরচ বেড়ে যায়। তাই দাম ঠিক করার সময় এটা মাথায় রাখতে হয়।আমি নিজে করতে চাইলে IRC, BIN, ট্রেড লাইসেন্স আর বিল অফ এন্ট্রি নিয়ে কাস্টমসে যাই।
কাগজ জমা দিলে ওরা চেক করে কত টাকা দিতে হবে বলে দেয়। টাকা জমা দিলে মাল ছেড়ে দেয়। প্রথমবার একটু ঘোরাঘুরি লাগে, পরে সোজা হয়ে যায়।অনেকেই ঝামেলা এড়াতে C&F এজেন্ট ধরে। ওরা ১৫০-৩০ টাকা নেয়, কিন্তু সব কাজ ওরাই করে দেয়। নতুনদের জন্য এটা সহজ। আমি প্রথম ২-৩টা শিপমেন্ট এভাবেই করছি।আমার সাজেশন হলো, শুরুতে C&F দিয়ে করুন। পরে যখন সিস্টেম বুঝে যাবেন, তখন নিজে করার চেষ্টা করুন। এভাবে করলে প্রতি শিপমেন্টে ২-৩ হাজার টাকা বাঁচানো যায়।
আরো পড়ুন :ছোট বিজনেস শুরু করার জন্য বাজেট প্ল্যান
ছোট বিজনেস শুরু করার জন্য বাজেট প্ল্যান
আমার মতে অল্প টাকা দিয়েই শুরু করা যায়, বড় টাকা লাগে না। যদি হাতে ১০-১৫ হাজার টাকা থাকে তাহলে ছোট ছোট জিনিস দিয়ে শুরু করা ভালো। যেমন মোবাইল কাভার, হেডফোন, হেয়ার ক্লিপ, স্টিকার এসব। এগুলার দাম কম, শিপিং খরচও কম পড়ে। ১৫ হাজার টাকায় আলিবাবা থেকে ৭০-৮০ পিস মাল আনা যায়। প্রথমে ফেসবুকে আর পরিচিতদের কাছে বিক্রি করলে আলাদা মার্কেটিং খরচও লাগে না।যদি একটু বেশি, মানে ৩০-৫০ হাজার টাকা থাকে, তাহলে ব্যাগ, ঘড়ি, ছোট ইলেকট্রনিক্সের মতো জিনিস আনতে পারো।
এইগুলায় লাভ বেশি থাকে। ৫০ হাজার টাকায় ১০-১৫০ পিস মাল আসে পাইকারি রেটে। তখন পার পিসে খরচ কম পড়ে আর লাভও ভালো হয়।সবচেয়ে জরুরি হলো একবারে সব টাকা লাগানো যাবে না। প্রথমে ১০-২০ পিস এনে টেস্ট করো। যদি চলে তাহলে পরে বড় করে অর্ডার দাও। আর শিপিং আর কাস্টমসের জন্য আলাদা ২০-৩০% টাকা হাতে রাখবা। আমি নিজে ১২ হাজার দিয়ে শুরু করছিলাম, ওই লাভ দিয়েই আস্তে আস্তে বড় করছি। অল্প পুঁজি থাকলেও প্ল্যান করে নামলে লস খাওয়ার চান্স কম থাকে।
C&F এজেন্ট ছাড়া নিজে প্রোডাক্ট ছাড়ানোর প্রসেস
অনেকেই ভাবে C&F ছাড়া মাল ছাড়ানো যায় না, আসলে যায়। শুধু একটু সময় দিতে হয় আর কাগজপত্র ঠিক রাখতে হয়। আমি প্রথমে চট্টগ্রাম বা ঢাকা এয়ারপোর্ট কাস্টমসে যাই। সাথে IRC, BIN, ট্রেড লাইসেন্স আর বিল অফ এন্ট্রি নিয়ে যাই।ওখানে গিয়ে কাস্টমস অফিসারকে কাগজগুলো দেখাই। ওরা চেক করে বলে এই মালে কত টাকা ডিউটি আসবে। আমি নোটিশ অনুযায়ী ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দেই। জমার রিসিট নিয়ে আবার কাস্টমসে দেখাই।
সব ঠিক থাকলে ওরা ডেলিভারি অর্ডার দিয়ে দেয়। ওই কাগজ নিয়ে ওয়্যারহাউজে গেলে মাল বুঝিয়ে দেয়। এখানে একটু লাইনে দাঁড়াতে হয়, কিন্তু কাজ হয়ে যায়।সমস্যা হয় তখনই যখন ইনভয়েসে ভুল থাকে। তাই আমি সাপ্লায়ারকে আগেই বলি নাম, দাম, HS Code সব ঠিকমতো লিখতে। ভুল থাকলে কাস্টমস আটকে দেয় আর জরিমানা করে।প্রথমবার আমার ২ দিন লাগছিল কারণ বুঝতে সময় লাগছিল। কিন্তু একবার শিখে গেলে পরের বার ৪-৫ ঘণ্টায় কাজ শেষ। আর C&F এর ২-৩ হাজার টাকা সেভ হয়। সময় থাকলে নিজে করার চেষ্টা করুন, না পারলে এজেন্ট ধরুন।
সাধারণ ভুল ও সেগুলো এড়ানোর উপায়
চীন থেকে মাল আনতে গেলে প্রথমবার সবাই কিছু ভুল করেই। আমি নিজেও করেছি, তাই বলতেছি যাতে আপনি বেঁচে যান। সবচেয়ে বড় ভুল হলো না দেখে সাপ্লায়ারকে টাকা দিয়ে দেওয়া। আলিবাবাতে ভেরিফাইড না দেখে TT করে দিলে টাকা মেরে দেয়।দ্বিতীয় ভুল হলো শিপিং খরচ হিসাব না করা। অনেকে শুধু প্রোডাক্টের দাম দেখে অর্ডার দেয়। পরে দেখে শিপিং আর কাস্টমস মিলিয়ে দাম ডাবল হয়ে গেছে। আমি তাই সবসময় আগে টোটাল খরচ হিসাব করি।
আরেকটা ভুল হলো কোয়ালিটি চেক না করা। সস্তা দেখে অর্ডার দিলে মাল হাতে পেয়ে দেখা যায় ইউজ করা যায় না। তাই আমি আগে ২-৩ পিস স্যাম্পল নেই। ভালো হলে বড় অর্ডার দেই।অনেকেই আবার একবারে অনেক মাল আনে। বিক্রি না হলে সব স্টকে পড়ে থাকে। আমি বলব শুরুতে ২০-৫০ পিস দিয়ে টেস্ট করুন। চললে পরে বড় করে আনুন।শেষ কথা হলো, তাড়াহুড়া করবেন না। সাপ্লায়ার ভেরিফাই করুন, দাম কষাকষি করুন, কাগজ চেক করুন। এই তিনটা ঠিক থাকলে ৯০% রিস্ক কমে যায়।
লাভ-লোকসানের হিসাব ও দাম নির্ধারণ
মাল আনার পর সবচেয়ে জরুরি হলো ঠিকমতো দাম ঠিক করা। আমি প্রথমে সব খরচ যোগ করি। প্রোডাক্টের দাম, শিপিং খরচ, কাস্টমস ট্যাক্স, প্যাকিং খরচ সব মিলিয়ে মোট খরচ বের করি। এটাকে বলে ল্যান্ডিং কস্ট।ধরুন একটা প্রোডাক্ট আনতে খরচ পড়ল ১০ টাকা। আমি কখনো ১০ টাকায় বিক্রি করি না। কারণ মার্কেটিং, ডেলিভারি, রিটার্নের খরচও থাকে। তাই আমি কমপক্ষে ৩০-৫০% লাভ ধরে দাম বসাই। তাহলে ১০ টাকার জিনিস ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি করি।আরেকটা জিনিস দেখি, মার্কেটে ওই জিনিস কত দামে বিক্রি হচ্ছে।
দারাজ, ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে চেক করি। যদি আমার দাম অনেক বেশি হয়, কেউ কিনবে না। তাই দাম এমন রাখি যাতে আমার লাভও থাকে, কাস্টমারও খুশি থাকে।অনেক সময় একটু কম লাভে শুরু করি। কারণ নতুন প্রোডাক্ট, আগে মানুষকে বিশ্বাস করাতে হয়। ১০-২০টা বিক্রি হওয়ার পর রিভিউ এলে তখন দাম একটু বাড়াই। এভাবে আস্তে আস্তে লাভ বাড়ে।সবশেষে একটা খাতায় লিখে রাখি কত পিস বিক্রি হলো, কত লাভ হলো। হিসাব ঠিক না রাখলে ব্যবসা টিকবে না। লাভ বুঝতে পারলেই বুঝবেন কোন প্রোডাক্ট আবার আনবেন আর কোনটা বাদ দেবেন।
আরো পড়ুন :প্রোডাক্টে সমস্যা হলে রিটার্ন/রিফান্ড নেয়ার প্রসেস
শেষ কথা
চীন থেকে মাল আনা প্রথমে জটিল লাগে, কিন্তু একবার করে ফেললে সহজ হয়ে যায়। ছোট অর্ডার দিয়ে শুরু করুন, অভিজ্ঞতা হলে ধীরে ধীরে বাড়ান।সাপ্লায়ার ভেরিফাই করুন, দাম কষাকষি করুন, মাল হাতে পেয়ে কোয়ালিটি চেক করুন। তাড়াহুড়া করলেই লস হয়।সব খরচ হিসাব করে দাম ঠিক করুন। লাভ না থাকলে ব্যবসা টিকবে না। খাতায় লিখে রাখলে হিসাব গোলমাল হবে না।এক জায়গায় আটকে থাকবেন না। দুই-তিনটা সাপ্লায়ার আর প্রোডাক্ট হাতে রাখুন।সবচেয়ে বড় কথা, ভয় পেয়ে বসে থাকবেন না। ভুল হবে, শিখবেন, আবার করবেন। এভাবেই আগাবে।

জুঁই ম্যাক্সনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url