অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম
আমাদের জীবনে আয়-রোজগার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই আয়ের হিসাব রাখাটাও জরুরি। আয়কর রিটার্ন হলো সেই হিসাব সরকারের কাছে জমা দেওয়ার একটি সহজ ও নিয়মিত প্রক্রিয়া।
সবকিছু এখন হাতের মুঠোয়। সময়মতো রিটার্ন জমা দিলে শুধু ঝামেলা থেকে বাঁচা যায় না, বরং ভবিষ্যতে ব্যাংক লোন, পাসপোর্ট, ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো কাজগুলোতেও অনেক সুবিধা পাওয়া যায়।
সূচিপত্র: অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সকল নিয়ম
- ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন কী এবং কাদের জন্য বাধ্যতামূলক
- অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুবিধা
- রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস
- ই-টিআইএন রেজিস্ট্রেশন এবং লগইন প্রক্রিয়া
- e-Return ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম
- রিটার্ন ফরম পূরণের ধাপসমূহ
- আয়ের উৎস ও খরচের হিসাব কিভাবে দেখাবেন
- টিডিএস, অগ্রিম কর এবং রেয়াতের হিসাব
- অনলাইনে কর পরিশোধের পদ্ধতি
- রিটার্ন সাবমিট এবং প্রাপ্তি স্বীকারপত্র ডাউনলোড
- ভুল হলে সংশোধনের নিয়ম
- রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা ও জটিলতা
- রিটার্নের কপি সংরক্ষণের গুরুত্ব
- TIN সার্টিফিকেট ডাউনলোড ও ব্যবহার
- অনলাইন রিটার্নের সুবিধা ও ভবিষ্যৎ
- শেষ কথা
ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন কী এবং কাদের জন্য বাধ্যতামূলক
আমার মতে ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন হলো একটা হিসাবপত্র যেটা আমরা সরকারকে জমা দিই। সারা বছরে আমি কত টাকা আয় করলাম, কোথা থেকে আয় করলাম, আর কত টাকা খরচ করলাম - এই সবকিছু লিখে একটা ফরমে জমা দিতে হয়। এটাকেই বলে রিটার্ন জমা দেওয়া।অনেকেই ভাবে শুধু যারা চাকরি করে বা যাদের অনেক টাকা আছে তারাই রিটার্ন দেয়। আসলে বিষয়টা তা না। এখন সরকারের নিয়ম অনুযায়ী যাদের টিআইএন আছে তাদের বেশিরভাগকেই প্রতি বছর রিটার্ন জমা দিতে হয়। এমনকি যদি আপনার আয় করযোগ্য সীমার নিচেও হয়, তবুও শূন্য রিটার্ন দিতে হয়।
আমার এক বড় ভাই ফ্রিল্যান্সিং করে। উনি প্রথমে ভাবতেন আয় কম তো রিটার্ন দেওয়ার দরকার নাই। পরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে, লোন নিতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ছিলেন। কারণ এখন অনেক জায়গায় রিটার্নের কাগজ চায়। তাই অল্প আয় হলেও রিটার্ন জমা দেওয়া ভালো।আরেকটা কথা হলো, সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে পরে জরিমানা আসে। তখন ঝামেলা বাড়ে। তাই বছরে একবার নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে বসে হিসাব করে জমা দিয়ে দিলে মাথা হালকা থাকে।
অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুবিধা
আগে রিটার্ন জমা দিতে হলে অফিসে লাইনে দাঁড়াতে হতো, ফরম নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। এখন অনলাইনে করা যায় বলে অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমার কাছে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ঘরে বসেই কাজটা সেরে ফেলা যায়। রাত ১২টায় মাথায় আসলেও মোবাইল বের করে সাবমিট করে দেওয়া যায়।আরেকটা ভালো দিক হলো হিসাবের ভুল কম হয়। অনলাইন সিস্টেমে অটো ক্যালকুলেশন হয়ে যায়। আমি নিজে প্রথমবার কাগজে করছিলাম, যোগ-বিয়োগে গোলমাল করে ফেলছিলাম। অনলাইনে করলে সেটা হয় না। কোথাও ভুল থাকলে সিস্টেমই ধরে দেয়।
সময়ও বাঁচে অনেক। অফিসে গেলে আধা দিন চলে যেত। এখন ৩০-৪০ মিনিটে সব ফিলআপ করে সাবমিট করা যায়। আর সাবমিট করার সাথে সাথেই একটা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পাওয়া যায়। ওইটা ডাউনলোড করে রাখলেই হলো। পরে ব্যাংক বা অন্য কোথাও লাগলে দেখানো যায়।সব মিলিয়ে আমার মনে হয় যারা একবার অনলাইনে রিটার্ন দেয়, তারা আর অফিসে যাইতে চায় না। ঝামেলা কম, ঝটপট হয়ে যায়, আর প্রমাণও হাতে থাকে।
রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস
অনলাইনে রিটার্ন দিতে বসার আগে সব কাগজপত্র হাতের কাছে রাখা ভালো। না হলে মাঝখানে আটকে যাই। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি, প্রথমে লাগে টিআইএন সার্টিফিকেট আর এনআইডি কার্ডের কপি। এগুলা ছাড়া লগইনই করতে পারবেন না।এরপর লাগে আয়ের প্রমাণ। যদি চাকরি করেন তাহলে স্যালারি সার্টিফিকেট আর ব্যাংক স্টেটমেন্ট লাগবে। আমি ফ্রিল্যান্সিং করি, তাই আমার পেপাল আর ব্যাংকের স্টেটমেন্ট নামাই। যাদের ব্যবসা আছে তাদের ট্রেড লাইসেন্স আর খরচের ভাউচার লাগে।
আরেকটা জিনিস হলো বিনিয়োগের কাগজ। যদি সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন, ডিপিএস করেন, বা ইন্স্যুরেন্স থাকে, তাহলে ওইগুলার কাগজ রাখবেন। কারণ এগুলা দেখালে ট্যাক্স রেয়াত পাওয়া যায়। আমি প্রথমবার এগুলা মিস করছিলাম, পরে ট্যাক্স বেশি আসছিল।সব কাগজ একটা ফোল্ডারে স্ক্যান করে রাখলে ভালো। অনলাইনে আপলোড করতে হয়, আর পরে লাগলেও খুঁজে পাওয়া যায়। এভাবে আগে থেকে গুছায় রাখলে ২০-৩০ মিনিটে রিটার্ন জমা দেওয়া যায়, কোনো টেনশন থাকে না।
আরো পড়ুন :রিটার্নের কপি সংরক্ষণের গুরুত্ব
রিটার্ন সাবমিট করার পর যে প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পান, ওইটা আসলে আপনার রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রমাণ। এটা ছাড়া পরে ব্যাংক লোন, পাসপোর্ট রিনিউ, ট্রেড লাইসেন্স কোনোটাই করতে পারবেন না। তাই এটাকে হালকা ভাবলে চলবে না।আমি সবসময় সাবমিট করার সাথে পিডিএফটা ডাউনলোড করে গুগল ড্রাইভে সেভ করে রাখি। ফোন হারালেও যেন কপি থাকে।
প্রিন্ট করে একটা ফাইলেও রাখতে পারেন, এতে নিশ্চিন্ত থাকা যায়অনেকেই ভাবে সাইটে লগইন করলেই তো পাওয়া যাবে। কিন্তু সাইটে সমস্যা হলে বা পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে তখন বিপদ। তাই নিজের কাছে একটা কপি রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ।মোট কথা, এই কাগজটা এখন অনেক কাজের জন্য বাধ্যতামূলক। জমা দেওয়ার পর ২ মিনিট খরচ করে কপিটা সেভ করে রাখলে পরে ঝামেলা থেকে বাঁচা যায়।
ই-টিআইএন রেজিস্ট্রেশন এবং লগইন প্রক্রিয়া
অনলাইনে রিটার্ন দিতে গেলে প্রথমে ই-টিআইএন থাকা লাগে। আমার যখন লাগছিল তখন আমি এনবিআরের ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজেই করছিলাম। আসলে কঠিন কিছু না, ১০-১৫ মিনিট লাগে। শুধু এনআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর আর ইমেইল দিতে হয়। ওখানে একটা ফরম ফিলাপ করলেই সাথে টিআইএন নাম্বার চলে আসে।
টিআইএন পাওয়ার পর লগইন করতে হয় e-Return সাইটে। প্রথমবার লগইন করার সময় মোবাইলে একটা ওটিপি আসে। ওটা দিলেই অ্যাকাউন্ট এক্টিভ হয়ে যায়। আমি প্রথমে ভাবছিলাম কম্পিউটার লাগবে, কিন্তু মোবাইল দিয়েই সব করা যায়।একবার লগইন হয়ে গেলে পরে শুধু টিআইএন আর পাসওয়ার্ড দিলেই ঢোকা যায়। পাসওয়ার্ড ভুলে গেলেও রিকভার করার অপশন আছে। তাই নাম্বার আর ইমেইল যেটা দিয়েছেন ওইটা একটিভ রাখবেন।
e-Return ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খোলার নিয়ম
টিআইএন হাতে পাওয়ার পর রিটার্ন জমা দিতে হলে e-Return এর ওয়েবসাইটে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। আমি প্রথমবার গুগলে “e-Return NBR” লিখে সার্চ দিয়ে সাইটে ঢুকছিলাম। ওখানে হোমপেজেই “Register” লিখা একটা অপশন পাবেন। ওইটাতে ক্লিক করলে আপনার টিআইএন নম্বর চাইবে। টিআইএনটা ঠিকমতো বসায় দিলেই পরের স্টেপ চলে আসবে।রেজিস্ট্রেশনের সময় মোবাইল নম্বর আর ইমেইলটা একটু সাবধানে দিতে হয়। কারণ সাবমিট করার পর সাথে ওই নাম্বারে একটা ওটিপি আসবে।
ওই কোডটা বসালেই অ্যাকাউন্ট খুলে যায়। আমার বেলায় মেসেজ আসতে ১ মিনিটের মতো লাগছিল। ইমেইলটাও ঠিক দেবেন, কারণ পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে ওইখানেই রিকভার লিঙ্ক যাবে।অ্যাকাউন্ট খোলা হয়ে গেলে একটা ড্যাশবোর্ড দেখাবে। ওইখানেই “Start New Return” নামে একটা বাটন পাবেন। ওইটা চাপলেই আপনার রিটার্ন ফরম খুলে যাবে। আমি প্রথমে ভাবছিলাম অনেক কাগজ আপলোড করতে হবে, কিন্তু আসলে শুরুতে শুধু বেসিক ইনফো দিলেই হয়।আমার মতে এখানে তাড়াহুড়া না করে ধীরে ধীরে তথ্য দিলে ভালো। একবার অ্যাকাউন্ট খুলে গেলে প্রতি বছর শুধু লগইন করে রিটার্ন জমা দিলেই হবে। নতুন করে আর রেজিস্ট্রেশন করা লাগে না।
রিটার্ন ফরম পূরণের ধাপসমূহ
অ্যাকাউন্টে লগইন করার পর “Start New Return” এ ক্লিক করলেই আসল ফরমটা চলে আসবে। প্রথমে আপনার নাম, ঠিকানা, পেশা এইসব তথ্য দেখাবে। ওগুলা আগে চেক করে নেবেন ঠিক আছে কিনা। যদি কোথাও ভুল থাকে তাহলে এখনই ঠিক করে নেওয়া ভালো, পরে ঝামেলা হয়।এরপর আসবে আয়ের অংশ। আমি যেখান থেকে টাকা পাই সেটা সিলেক্ট করে দিই। আপনি যদি চাকরি করেন তাহলে “Salary” সিলেক্ট করবেন, ব্যবসা হলে “Business”, আর ফ্রিল্যান্সিং করলে “Other Income” এ দিয়ে দেবেন।
প্রতিটা অপশনে গেলে আলাদা ঘর আসে যেখানে টাকার অঙ্ক বসাতে হয়। আমি সাধারণত ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে মোট আয়টা হিসাব করে বসাই।আয় দেওয়ার পর খরচের ঘর আসে। এখানে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, অফিস খরচ যেগুলা লাগে সেগুলা লিখতে হয়। তবে ভাউচার থাকলে ভালো, না থাকলেও আনুমানিক দেওয়া যায়। সব তথ্য দেওয়া শেষ হলে সিস্টেম নিজেই যোগ-বিয়োগ করে দেখায় দিবে আপনার কত ট্যাক্স আসলো বা রিফান্ড পাবেন।
আরো পড়ুন :TIN সার্টিফিকেট ডাউনলোড ও ব্যবহার
টিআইএন রেজিস্ট্রেশন শেষ করলেই অটোমেটিক একটা সার্টিফিকেট তৈরি হয়ে যায়। এটা ডাউনলোড করতে হয় e-Return এর ড্যাশবোর্ড থেকে। আমি প্রথমবার খেয়াল করিনি, পরে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে ধরা খাইছি।সার্টিফিকেটটা আসলে আপনার ট্যাক্স আইডির প্রমাণ। ব্যাংকে, ট্রেড লাইসেন্স করতে, জমি রেজিস্ট্রি করতে, এমনকি কিছু চাকরিতেও এটা চায়।
এখন প্রায় সব জায়গায় TIN লাগে, তাই পিডিএফটা ফোনে আর মেইলে সেভ করে রাখা ভালো।ডাউনলোড করতে লগইন করে “TIN Certificate” অপশনে গেলেই পেয়ে যাবেন। কোনো টাকা লাগে না, এক ক্লিকেই নেমে আসে। হারায় গেলেও সমস্যা নাই, আবার লগইন করে নামানো যায়।মোট কথা, রেজিস্ট্রেশন করলেই কাজ শেষ না। সার্টিফিকেটটা নামিয়ে রাখলেই পরে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না।
আয়ের উৎস ও খরচের হিসাব কিভাবে দেখাবেন
রিটার্ন ফিলাপ করার সময় সবচেয়ে জরুরি হলো আপনার আয়টা কোথা থেকে আসছে সেটা ঠিকমতো দেখানো। আমি যেহেতু ফ্রিল্যান্সিং করি, তাই আমার ব্যাংক স্টেটমেন্ট আর পেপালের হিসাব দেখে মোট আয় বের করে বসাই। আপনি যদি চাকরি করেন তাহলে অফিস থেকে যে স্যালারি সার্টিফিকেট দেয় ওইটা দেখে বেসিক, বোনাস, ওভারটাইম সব আলাদা করে লিখবেন। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে মাসে কত বিক্রি হলো আর তার বিপরীতে খরচ কত হলো সেটা হিসাব করতে হয়।খরচের জায়গাটাও বাদ দেওয়া যাবে না। যেমন দোকানের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ইন্টারনেট বিল, কর্মচারীর বেতন এইসব দেখানো যায়। আমার এক বন্ধু ব্যবসা করে, ওর দোকানের ভাড়ার রশিদগুলা জমায় রাখে।
পরে ওইগুলা রিটার্নে খরচ হিসেবে দেখায়। এতে আয়ের উপর ট্যাক্স কম আসে। যদি ভাউচার থাকে তাহলে সবচেয়ে ভালো, না থাকলেও আনুমানিক খরচ দেখানো যায়।আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি, আয় আর খরচের হিসাব গড়মিল হলে পরে ট্যাক্স অফিস থেকে নোটিশ আসতে পারে। তাই নিজের কাছে যা প্রমাণ আছে ওই অনুযায়ীই লিখবেন। বেশি বাড়ায় লিখলে যেমন সমস্যা, কম লিখলেও লস আপনারই।সবচেয়ে সহজ হলো মাস শেষে একটা খাতায় লিখে রাখা। আমি ফোনের নোটসে লিখে রাখি। পরে রিটার্নের সময় ওইখান থেকে দেখে বসায় দিই। এভাবে করলে হিসাব গড়মিল হয় না আর সময়ও বাঁচে।
টিডিএস, অগ্রিম কর এবং রেয়াতের হিসাব
অনলাইনে রিটার্ন করার সময় একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হয়, সেটা হলো টিডিএস। মানে ব্যাংক বা অফিস থেকে টাকা তোলার সময় আগেই কিছু টাকা কেটে রাখে। যেমন আমি ব্যাংকে সেভিংসের উপর যে লাভ পাই, ওখান থেকে ওরাই ১০% কেটে রাখে। এই কাটা টাকাটা রিটার্নে দেখাতে হয়। দেখালে আপনাকে আবার আলাদা করে ওই টাকার উপর ট্যাক্স দিতে হবে না।এরপর আসে অগ্রিম করের হিসাব। কেউ যদি ব্যবসা করে বা ফ্রিল্যান্সিং করে, তাহলে বছরের মাঝে মাঝে একটু একটু করে ট্যাক্স জমা দিতে হয়। এটাকে বলে অগ্রিম কর। আমি যখন ফ্রিল্যান্সিং করতাম তখন ত্রৈমাসিক হিসাব করে জমা দিতাম। এটা দেখালে বছরের শেষে একবারে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয় না।
সবচেয়ে ভালো লাগে রেয়াতের অংশটা। আপনি যদি সঞ্চয়পত্র কিনেন, ডিপিএস করেন, বা লাইফ ইন্স্যুরেন্স করেন তাহলে সরকার কিছু ট্যাক্স ছাড় দেয়। আমি প্রতি মাসে ডিপিএস করি, তাই ওই কাগজটা স্ক্যান করে আপলোড দিই। তখন আমার ট্যাক্সের অঙ্কটা একটু কমে আসে।এই অংশটা একটু মন দিয়ে করতে হয়। কারণ এখানেই অনেকে ট্যাক্স বেশি দিয়ে ফেলে শুধু কাগজ না দেখানোর কারণে। আমার পরামর্শ হলো বছরের শুরু থেকেই সব ইনভেস্টমেন্টের কাগজ এক জায়গায় রাখুন। তাহলে রিটার্নের সময় খুঁজতে হবে না।
অনলাইনে কর পরিশোধের পদ্ধতি
রিটার্ন বানোর পর যদি দেখেন ট্যাক্স আসছে, তাহলে ওইটা না দিলে সাবমিট হবে না। আগে মানুষ ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে জমা দিত। এখন আর সেই ঝামেলা নাই। e-Return এর ভিতরেই পেমেন্টের অপশন আছে। “Pay Now” তে ক্লিক করলেই বিকাশ, নগদ, কার্ড সব চলে আসে।আমি সবসময় বিকাশ দিয়ে দিই কারণ মোবাইলেই হয়ে যায়। পেমেন্ট করার সাথে মোবাইলে মেসেজ আসে আর সাইট থেকে চালান কপি ডাউনলোড করা যায়।
ওই কপিটা আমি ড্রাইভে সেভ করে রাখি। পরে দরকার হলে বের করা সহজ হয়।যাদের অনলাইন পেমেন্টে ভরসা কম তারা চালানটা প্রিন্ট করে ব্যাংকে জমা দিতে পারেন। সোনালী, অগ্রণী, জনতা ব্যাংকে এটা নেয়। তবে ব্যাংকে দিলে আপডেট হতে ২-৩ দিন লাগে। তাই শেষ সময়ে না দেওয়াই ভালো।পেমেন্ট হয়ে গেলে ড্যাশবোর্ডে “Paid” দেখাবে। তখন বুঝবেন কাজ শেষ। শুধু পেমেন্টের রিসিপ্টটা হারাবেন না, এটা প্রমাণ হিসেবে লাগে।
আরো পড়ুন :অনলাইন রিটার্নের সুবিধা ও ভবিষ্যৎ
আগে রিটার্ন জমা দিতে মানে ছিল সারাদিন অফিসে লাইনে দাঁড়ানো। এখন মোবাইল বা ল্যাপটপ থাকলেই ঘরে বসে ২০ মিনিটে কাজ শেষ। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা। সময় বাঁচে, দালের ঝামেলা নাই।ভুল হলে সাথে ধরা পড়ে, তাই ঠিক করে নেওয়া যায়। পেমেন্ট, সাবমিট, রিসিপ্ট সব এক জায়গাতেই হয়ে যায়।
আর সরকারও চাইতেছে সবাই যেন অনলাইনে আসে, তাই সামনে সিস্টেমটা আরও সহজ হবে। ভবিষ্যতে হয়তো অটো ফিলাপ হয়ে যাবে, শুধু চেক করে সাবমিট দিলেই হবে। যারা এখনো অফলাইনে করে তারা আস্তে আস্তে অনলাইনে শিফট হবে। আমার মনে হয় এটাই স্বাভাবিক।তাই আমাদের প্রত্যেকটা কাজ খুব মনোযোগ সহকারে করা লাগবে।
রিটার্ন সাবমিট এবং প্রাপ্তি স্বীকারপত্র ডাউনলোড
সব তথ্য দেওয়া আর পেমেন্ট করা শেষ হলে একদম শেষ ধাপ হলো রিটার্ন সাবমিট করা। এই জায়গায় একটু সাবধান থাকতে হয়। কারণ সাবমিট বাটনে চাপার আগে আমি দুইবার চেক করি কোথাও ভুল লিখছি কিনা। একবার সাবমিট করে দিলে আর এডিট করার সুযোগ থাকে না। তাই নাম, আয়, খরচের অঙ্কগুলো আবার মিলিয়ে নেওয়া ভালো।সাবমিট করার সাথে সাথেই স্ক্রিনে একটা রিসিভ কপি বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র চলে আসবে। ওটাই আসল প্রমাণ যে আপনি রিটার্ন জমা দিয়েছেন। আমি সাথে ওটা ডাউনলোড করে ফোনের গুগল ড্রাইভে রেখে দিই। পিডিএফটা প্রিন্ট করেও রাখতে পারেন যদি দরকার হয়।
এই কাগজটা পরে অনেক কাজে লাগে। ব্যাংক লোন নিতে গেলে, পাসপোর্ট রিনিউ করতে গেলে, ট্রেড লাইসেন্স করতে গেলে ওরা প্রথমেই রিটার্নের কপি চায়। আমার একবার লোনের সময় এটা না থাকায় ঘুরতে হইছিল। তখন বুঝছি এটা কত জরুরি।আর যদি কখনো কপিটা হারায় যায় তাহলেও চিন্তা নাই। আবার e-Return এ লগইন করে “Submitted Returns” সেকশনে গেলে আগের সব রিটার্ন পেয়ে যাবেন। ওখান থেকে যেকোনো সময় ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।
ভুল হলে সংশোধনের নিয়ম
মাঝে মাঝে তাড়াহুড়ায় রিটার্নে ভুল হয়ে যায়। আমার একবার আয়ের অঙ্কে একটা শূন্য বেশি পড়ে গেছিল। তখন খুব টেনশন হচ্ছিল যে এখন কি হবে। পরে জানতে পারলাম ভুল হলে ভয়ের কিছু নাই, সংশোধনের সুযোগ আছে। e-Return এ “Amendment Return” নামে একটা অপশন থাকে। ওখানে গেলে আবার নতুন করে ফরম খোলা যায়।সংশোধন করতে গেলে শুধু একটা কারণ লিখতে হয় কেন ঠিক করতেছেন। যেমন “Typing Mistake” বা “New Document Received” লিখে দিলেই হয়।
তারপর ভুল জায়গাটা ঠিক করে আবার সাবমিট করে দিলে হয়ে যায়। তবে খেয়াল রাখবেন, একবার সাবমিট করার পরই শুধু এমেন্ডমেন্ট করা যায়। সাবমিট করার আগে ভুল ধরা পড়লে তো আরও সহজ, তখন এডিট করেই ঠিক করে নেওয়া যায়।আমার পরামর্শ হলো সাবমিট করার আগে পুরো ফরমটা একবার প্রিন্ট প্রিভিউ দেখে নেওয়া। তাহলে চোখে ভুল ধরা পড়ে। ছোট ভুলের জন্য পরে ঝামেলা করা লাগে, তাই প্রথমেই সাবধান থাকা ভালো।এমেন্ডমেন্ট করলে আগের রিটার্ন বাতিল হয়ে নতুনটা আপডেট হয়ে যায়।
রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা ও জটিলতা
সময়মতো রিটার্ন জমা না দিলে সবার আগে জরিমানা শুরু হয়। নিয়ম হলো প্রতিদিনের জন্য ৫০ টাকা করে যোগ হতে থাকে। শুনতে ছোট মনে হলেও ২-৩ মাস গেলে বেশ বড় অঙ্ক হয়ে যায়। আমার এক বন্ধু গতবার দেরি করছিল, পরে ৩ হাজারের মতো জরিমানা দিতে হইছে।জরিমানার চেয়ে বড় ঝামেলা হলো পরে সব জায়গায় আটকে যাওয়া। এখন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে, লোন নিতে গেলে, পাসপোর্ট রিনিউ করতে গেলে, ট্রেড লাইসেন্স করতে গেলে সব জায়গায় রিটার্নের কপি চায়।
না থাকলে কাজ আটকে থাকে। সরকার এখন এটা বাধ্যতামূলক করে দিছে প্রায় সব কাজের জন্য।আরেকটা সমস্যা হলো ট্যাক্স অফিস থেকে নোটিশ আসা। আমি দেখছি যারা ২-৩ বছর রিটার্ন দেয় না, তাদের নামে পরে নোটিশ চলে আসে। তখন দৌড়াদৌড়ি করে জমা দিতে হয়, সাথে জরিমানাও দিতে হয়। এটা খুবই বিরক্তিকর।তাই আমার পরামর্শ হলো নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই জমা দিয়ে দেওয়া। শেষ সময়ে সার্ভার স্লো হয়ে যায়, তখন টেনশন আরো বেড়ে যায়। সময় থাকতে করলে সব ঝামেলা থেকে বাঁচা যায়।
আরো পড়ুন :অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুবিধা
জুঁই ম্যাক্সনীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url